অজিত কুমার দাশ ছাতক উপজেলা প্রতিনিধি:
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মেশিনারিজ মেরামতের পর শুরু উৎপাদন, বছরে ২৫ হাজার স্লিপার তৈরির লক্ষ্যমাত্রা
অজিত কুমার দাশ,ছাতক উপজেলা প্রতিনিধি:
দীর্ঘ প্রায় এক বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে উৎপাদনে ফিরেছে সুনামগঞ্জের ছাতকে অবস্থিত বাংলাদেশ রেলওয়ের একমাত্র সরকারি কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট। গত রোববার থেকে প্লান্টটিতে পুরোদমে কংক্রিট স্লিপার উৎপাদন শুরু হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন পর কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে গুরুত্বপূর্ণ এ সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, নানা যান্ত্রিক জটিলতা, কাঁচামালের সংকট, জনবল ঘাটতি এবং সর্বশেষ ভয়াবহ বন্যায় প্লান্টের গুরুত্বপূর্ণ মেশিনারিজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ ছিল। বন্যার পানি পুরো প্লান্ট এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় যন্ত্রপাতির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরে ক্ষতিগ্রস্ত মেশিনারিজ মেরামত, যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন এবং একাধিক ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে পুনরায় উৎপাদন কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
বারবার বন্ধ হয়েছে উৎপাদন
ছাতকের এ কংক্রিট স্লিপার প্লান্টটি দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যায় জর্জরিত। এর আগে একাধিকবার উৎপাদন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও যান্ত্রিক ত্রুটি ও কাঁচামালের সংকটের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছর কয়েক দফায় উৎপাদন কার্যক্রম সচল করার চেষ্টা করা হলেও স্থায়ীভাবে তা চালু রাখা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে ভয়াবহ বন্যার পর মেশিনারিজের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উৎপাদন উপযোগী করে তুলতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়।
বছরে ২৫ হাজার স্লিপার উৎপাদনের লক্ষ্য
নতুন করে উৎপাদন শুরুর পর প্লান্টটিতে আগামী এক বছরে প্রায় ২৫ হাজার কংক্রিট স্লিপার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সপ্তাহে ছয় দিন প্রতিদিন ২৪০টি করে স্লিপার উৎপাদনের কথা রয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বাস কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্লান্টটির উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তবে পঞ্চগড়, বাংলাবান্ধা ও জামালপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেসরকারি উদ্যোগে একাধিক কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট গড়ে ওঠায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সেসব প্রতিষ্ঠান থেকেও স্লিপার সংগ্রহ করছে। এ অবস্থায় ছাতকের সরকারি প্লান্টের উৎপাদন সক্ষমতা যথাযথভাবে কাজে লাগানো এবং নিয়মিত উৎপাদন অব্যাহত রাখার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
১৯৮৮ সালে যাত্রা শুরু,রেললাইনকে আরও মজবুত, টেকসই ও নিরাপদ করার লক্ষ্য নিয়ে তৎকালীন সরকারের উদ্যোগে ১৯৮৮ সালে ছাতকে এ কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়। দৈনিক ২৬৪টি কংক্রিট স্লিপার উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্লান্টটি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা পূরণ করে আসছে।
কাঠের স্লিপারের তুলনায় কংক্রিটের স্লিপার অধিক টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় আধুনিক রেলপথে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। ছাতক প্লান্টে উৎপাদিত স্লিপার মূলত বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন রেলপথে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
প্রতিষ্ঠার পর ২০০০ সাল পর্যন্ত প্লান্টটি মোটামুটি স্বাভাবিক গতিতে চললেও পরবর্তীতে নানা সংকটে পড়ে। ২০১২, ২০১৪, ২০১৬ ও ২০২০ সালেও বিভিন্ন সময়ে উৎপাদন বন্ধ ও পুনরায় চালুর মধ্য দিয়ে চলতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
উৎপাদন শুরুর পর কর্মকর্তাদের পরিদর্শন,পুনরায় উৎপাদন শুরুর পর গত রোববার প্লান্ট এলাকা পরিদর্শন করেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিশ্বাস কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের পরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের অতিরিক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।এ সময় তারা উৎপাদন কার্যক্রম, মেশিনারিজের বর্তমান অবস্থা এবং স্লিপার তৈরির বিভিন্ন ধাপ সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন।
বিশ্বাস কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের পরিচালক মো. আশরাফ উদ্দিন বলেন, বন্যার পানিতে পুরো প্লান্ট তলিয়ে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মেশিনারিজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রাংশ মেরামত ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে সময় লেগেছে। বর্তমানে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করে আবারও উৎপাদন শুরু করা হয়েছে।বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবিব বলেন, প্রায় এক বছর বন্ধ থাকার পর প্রয়োজনীয় মেরামতকাজ শেষ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্লান্টটি পুনরায় চালু করেছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সপ্তাহে ছয় দিন নিরবচ্ছিন্নভাবে স্লিপার উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে ছাতকের এ সরকারি কংক্রিট স্লিপার প্লান্ট পুনরায় উৎপাদনে ফেরায় রেলওয়ের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে প্লান্টটির স্থায়ী ও নিয়মিত উৎপাদন অব্যাহত রাখার দাবি আরও জোরালো হয়েছে।