দিরাই প্রতিনিধি: কামরুল হাসান মিটু
মাদক নির্মূলের লক্ষ্যে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও সাধারণ জনগণের উদ্যোগে নানা কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। মাদকবিরোধী অভিযান, সচেতনতামূলক সভা, উঠান বৈঠক, প্রচারণা এবং নিয়মিত অভিযানে বিভিন্ন সময় মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকের চালান আটক হওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলাতেও চলছে মাদকবিরোধী তৎপরতা। পুলিশ ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের সহযোগিতায় অনেক ক্ষেত্রে মাদক কারবারিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। উদ্ধার হচ্ছে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য।
কিন্তু এসব অভিযানের পরবর্তী ধাপ নিয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিরা আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই যদি জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে মাদক নির্মূলের প্রচেষ্টা কতটা কার্যকর হচ্ছে?
স্থানীয় একাধিক সচেতন নাগরিকের অভিযোগ- কোনো কোনো এলাকায় একজন মাদক কারবারিকে ধরিয়ে দিতে পুলিশকে তথ্য দেওয়ার পর তথ্যদাতাকেই পরবর্তীতে নানা ধরনের সামাজিক চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হয়। কারণ, অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিনে বের হয়ে পুনরায় মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়লে স্থানীয়ভাবে তথ্যদাতার পরিচয়ও অনেক সময় প্রকাশ হয়ে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন-
আমরা নিজের জীবন ও নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে মাদক কারবারিদের আটক করি। পরে তাদের আইন অনুযায়ী আদালতে পাঠানো হয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যেই তারা জামিনে বের হয়ে আসে। এরপর আবারও একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। বিষয়টি মাঠপর্যায়ে কাজ করা পুলিশ সদস্যদের জন্যও হতাশাজনক।
তবে কোনো আসামি জামিনে মুক্ত হবেন কি না সেটি আদালতের এখতিয়ার। আইন অনুযায়ী মাদক মামলায় জামিনের বিষয়ে রাষ্ট্র বা অভিযোগকারী পক্ষকে শুনানির সুযোগ দেওয়ার বিধান রয়েছে এবং আদালত অভিযোগের ভিত্তি ও অন্যান্য আইনগত বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেন।
তাই প্রশ্নটি শুধু কেন জামিন হলো?
এমন সরল প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্ন উঠছে, মাদকবিরোধী মামলাগুলোর তদন্ত, আলামত সংগ্রহ, মামলা পরিচালনা, সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কতটা শক্তিশালী ও কার্যকর হচ্ছে?
তথ্য দিয়ে ধরিয়ে দিয়েও ঝুঁকিতে সাধারণ মানুষ
একজন সচেতন মাদকবিরোধী কমিটির সদস্য বলেন-
আমরা নিজের এলাকাকে মাদকমুক্ত করতে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করি। মাদক কারবারিদের ধরিয়ে দিতে বিভিন্নভাবে সহায়তা করি। কিন্তু কয়েকদিন পর তারা বাইরে এসে আবার একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়লে আমাদের সঙ্গে তাদের বিরোধ তৈরি হয়। তখন আমরা নিজেরাই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাই।
তার ভাষ্য- মাদকবিরোধী অভিযানে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হলে তাদের নিরাপত্তা ও তথ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় একসময় মানুষ পুলিশকে তথ্য দিতে ভয় পাবে।
শুধু গ্রেপ্তার নয়, প্রয়োজন পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী মাদক অপরাধ আমলযোগ্য এবং আইনটিতে মাদক মামলার তদন্তের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমার বিধান রয়েছে। হাতেনাতে গ্রেপ্তার হওয়া আসামির ক্ষেত্রে তদন্ত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার বিধানও রয়েছে।
আইনে মাদক অপরাধের জন্য বিভিন্ন মাত্রার শাস্তির বিধান রয়েছে এবং পুনরায় অপরাধের ক্ষেত্রেও কঠোরতর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
তবু মাঠপর্যায়ে যদি একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বারবার মাদক ব্যবসার অভিযোগ ওঠে, তাকে বারবার গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরবর্তীতে আবারও সে একই কর্মকাণ্ডে ফিরে আসে—তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, মাদকবিরোধী ব্যবস্থার কোন পর্যায়ে দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে?
সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষের অভিযোগ- মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার ও মামলা হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও অনেক সময় পরবর্তী সময়ে ওই ব্যক্তিদের আবার এলাকায় দেখা যায়। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, জামিনে বের হওয়ার পর অভিযুক্তরা আগের মতোই মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন।
অবশ্য এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রতিটি মামলার আদালতের আদেশ, মামলার নথি, তদন্তের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো মামলা বা অভিযোগ আছে কি না তা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ গ্রেপ্তার হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়, এবং জামিনে মুক্ত হওয়াও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি আইনগত ধাপ।
তবে একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে যদি ধারাবাহিকভাবে মাদক ব্যবসার অভিযোগ ও মামলা থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের উচিত বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
প্রশ্ন উঠছে পুলিশের বিরুদ্ধেও নয়, ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে
মাদকবিরোধী অভিযানে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন এমন বক্তব্য যেমন রয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষও নিজেদের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছেন।
কিন্তু তাদের প্রশ্ন-
একজন মাদক কারবারিকে ধরতে যদি পুলিশ-জনগণকে এত পরিশ্রম করতে হয়, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি অল্প সময়ের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত হয়ে আবার একই কর্মকাণ্ডে ফিরে আসেন, সেই পরিস্থিতি প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কী কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে?
আরও প্রশ্ন উঠছে-
মাদক মামলার তদন্ত ও আলামত সংগ্রহ যথাযথ হচ্ছে কি না;
মামলার তদন্তে কোনো দুর্বলতা থাকছে কি না;
মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আগের মামলার তথ্য পরবর্তী মামলায় যথাযথভাবে বিবেচনায় আসছে কি না;
তথ্যদাতা ও মাদকবিরোধী স্বেচ্ছাসেবকদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে;
এবং জামিনে বের হওয়ার পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নতুন করে অপরাধের অভিযোগ উঠলে আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না।
মাদকমুক্ত সমাজের জন্য দরকার সমন্বিত উদ্যোগ
মাদক নির্মূল শুধু কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করে, কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে কিংবা কিছু মাদকদ্রব্য উদ্ধার করে শেষ করার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে তদন্ত, মামলা, আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, সীমান্ত ও পরিবহনপথে নজরদারি এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
তাই সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে হলে “ধরলাম এবং মামলা দিলাম” এই পর্যায়ে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো প্রক্রিয়ার জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশকে সহযোগিতা করা সাধারণ মানুষ যেন পরবর্তীতে বিপদে না পড়েন, সেজন্য তথ্যদাতার পরিচয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মাদক একটি পরিবারকে ধ্বংস করতে পারে, একটি তরুণের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে পারে এবং একটি এলাকার সামাজিক নিরাপত্তাকে বিপন্ন করতে পারে। তাই মাদকবিরোধী অভিযানকে লোকদেখানো কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে তদন্ত, মামলা, বিচার এবং অপরাধ পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ প্রতিটি ধাপে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই-
শুধু মাদক কারবারি ধরলেই কি মাদক নির্মূল হবে, নাকি গ্রেপ্তারের পর পুরো আইনি প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আইনজীবী, আদালতসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং মাদকবিরোধী সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।