কামরুল হাসান মিটু
সুনামগঞ্জ মানেই হাওর, নৌকা, ধান, মাছ আর লোকসংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ জনপদ। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় একসময় মিশে ছিল নানা লোকজ ঐতিহ্য। মাটির হাঁড়ি-পাতিল, ঢেঁকি, কাঠের নৌকা, গ্রামীণ খেলাধুলা, পিঠাপুলি, লোকগান কিংবা স্থানীয় খাবার—সবই ছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। আধুনিক প্রযুক্তি, নতুন খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে বহু পুরোনো ঐতিহ্য। কোনোটি প্রায় বিলুপ্ত, আবার কোনোটি টিকে আছে প্রবীণদের স্মৃতিতে।
সুনামগঞ্জের গ্রামীণ খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে স্থানীয়ভাবে পরিচিত শিকর-এর মতো পুরোনো খাবারের সম্পর্ক ছিল। মাটির তৈরি এই ঐতিহ্যবাহী খাবারের কথা এখনকার অনেকের কাছেই অজানা। বাজারে আধুনিক ও প্যাকেটজাত খাবারের বিস্তারে স্থানীয় এসব খাবারের প্রচলন কমে গেছে। একটি খাবারের বিলুপ্তির সঙ্গে হারিয়ে যায় শুধু তার স্বাদ নয়, হারিয়ে যায় তা তৈরির কৌশল ও স্মৃতিও।
একসময় গ্রামের বাড়িতে ঢেঁকি ছিল পরিচিত দৃশ্য। ধান ভানা ও বিভিন্ন খাদ্য তৈরিতে এর ব্যবহার ছিল। যন্ত্রচালিত মেশিনের কারণে এখন ঢেঁকির প্রয়োজন কমেছে। ফলে হারিয়ে গেছে গ্রামীণ জীবনের পরিচিত সেই শব্দও। প্রবীণদের কাছে ঢেঁকি শুধু একটি যন্ত্র নয় এটি তাঁদের শৈশব ও পারিবারিক জীবনের স্মৃতি।
মাটির হাঁড়ি, কলস, সরা ও পাতিল ছিল গ্রামীণ ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। বর্তমানে স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মৃৎশিল্পের চাহিদা কমেছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই পেশার সঙ্গে যুক্ত অনেক পরিবার জীবিকার প্রয়োজনে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মও আগের মতো এ পেশায় আগ্রহী নয়।
সুনামগঞ্জের জীবন হাওর ছাড়া কল্পনা করা যায় না। আর হাওরের সঙ্গে নৌকার সম্পর্ক বহু পুরোনো। একসময় কাঠের দেশি নৌকা ছিল যাতায়াত, মাছ ধরা ও কৃষিপণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যমগুলোর একটি। ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে সেই পুরোনো নৌকার ব্যবহার কমেছে। সঙ্গে বদলে গেছে মাঝিদের জীবনও। হারিয়ে যাচ্ছে নৌকা তৈরির পুরোনো কারিগরি জ্ঞান ও নৌকাকেন্দ্রিক কিছু লোকজ সংস্কৃতি।
গোল্লাছুট,দাঁড়িয়াবান্ধা, কানামাছি ও হাডুডুর মতো গ্রামীণ খেলাধুলা একসময় শিশু-কিশোরদের বিকেল মাতিয়ে রাখত। এখন মোবাইল, অনলাইন গেম ও ডিজিটাল বিনোদনে বদলে গেছে তাদের অবসর।
মাঠ কমে যাওয়ার পাশাপাশি হারিয়ে যাচ্ছে এসব খেলার চর্চাও। বাউল, ভাটিয়ালি ও অন্যান্য লোকজ গান সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিক বিনোদনের বিস্তারে নিয়মিত চর্চা কিছুটা কমলেও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে এখনো এসব ধারা টিকে আছে।
তবে নতুন প্রজন্মের কাছে এগুলো পৌঁছে দিতে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার পেছনে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, আধুনিক পণ্যের সহজলভ্যতা, ঐতিহ্যবাহী পেশায় আয় কমে যাওয়া এবং নতুন প্রজন্মের পেশাগত পরিবর্তনসহ নানা কারণ রয়েছে।
সুনামগঞ্জের ঐতিহ্য সংরক্ষণে সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে শুধু জাদুঘরে নিদর্শন সংরক্ষণ নয়, জীবিত ঐতিহ্যগুলোকে মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে ধরে রাখাও জরুরি।
প্রয়োজন বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যের তালিকা তৈরি, প্রবীণ কারিগর ও শিল্পীদের বক্তব্য সংরক্ষণ, পুরোনো ছবি ও তথ্য ডিজিটাল আর্কাইভে রাখা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানীয় ইতিহাস তুলে ধরা এবং ঐতিহ্যবাহী পণ্য ও খাবারের বাজার তৈরি করা। সুনামগঞ্জের উন্নয়ন হবে, জীবনযাত্রা বদলাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে যেন জেলার নিজস্ব পরিচয় হারিয়ে না যায়।
কারণ একদিন যদি নতুন প্রজন্মকে বলতে হয় এসব একসময় ছিল, তাহলে বুঝতে হবে আমরা শুধু একটি ঐতিহ্য নয়, আমাদের শিকড়েরও একটি অংশ হারিয়ে ফেলেছি।