দিলীপ কুমার দাশ, স্টাফ রিপোর্টার, সুনামগঞ্জ
চালিবন্দর মহাশ্মশানে সম্পন্ন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, শোকাহত পরিবার ও স্বজনেরা গভীর শোক, বেদনা ও বিষাদে ভারী হয়ে উঠেছে সিলেটের পরিবেশ।
পরলোকগমন করেছেন সিলেটের প্রগতিশীল বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার প্রয়াত অনন্ত বিজয় দাশের শ্রদ্ধেয় মাতা পীযূষ রানী দাশ (৭৫)। বুধবার ভোরে সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের গভীর ছায়া।
বুধবার সকালেই সিলেটের ঐতিহ্যবাহী চালিবন্দর মহাশ্মশানঘাটে সনাতন ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসারে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তাঁর প্রয়াণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তাঁর জামাতা ও সিলেট জেলা কর আইনজীবী সমিতির সভাপতি সমর বিজয় শেখর।
দীর্ঘ অসুস্থতা, বুকে জমে থাকা সন্তানের হারানোর বেদনা
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পীযূষ রানী দাশ দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও হৃদরোগসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি জীবনের সবচেয়ে গভীর শোকের ভারও তাঁকে বহন করতে হয়েছে দীর্ঘদিন।
২০১৫ সালের ১২ মে সিলেট নগরীর সুবিদবাজার এলাকায় নিজ বাসার সামনে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তাঁর জৈষ্ঠ পুত্র, বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ। পূবালী ব্যাংকের জাউয়া বাজার শাখায় কর্মরত অনন্ত বিজয়ের এমন মর্মান্তিক প্রয়াণ গোটা পরিবারকে গভীর শোকের সাগরে নিমজ্জিত করে।
যে মায়ের আঁচল ঘিরে ছিল সন্তানের স্বপ্ন, ভালোবাসা ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশা, সেই মাকেই জীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। প্রিয় পুত্রকে অকালে হারানোর অসহনীয় বেদনায় পীযূষ রানী দাশ ও তাঁর স্বামী রবীন্দ্র কুমার দাশ শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। স্বজনদের ভাষ্যমতে, সেই সময় থেকেই পীযূষ রানী দাশ দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী ছিলেন।
এক এক করে হারিয়ে গেলেন পরিবারের তিন প্রিয় মুখ
অনন্ত বিজয় দাশের মৃত্যুর প্রায় এক বছর পর পরলোকগমন করেন তাঁর পিতা রবীন্দ্র কুমার দাশ। আর এবার চিরবিদায় নিলেন সেই মমতাময়ী মা, যিনি একমাত্র সন্তানকে হারানোর গভীর ক্ষত বুকে নিয়েই জীবনের শেষ দিনগুলো অতিবাহিত করেছেন।
একটি পরিবারের জীবনে একের পর এক এমন বিয়োগান্তক ঘটনা সৃষ্টি করেছে অপূরণীয় শূন্যতা। পিতা, মাতা ও পুত্র—তিনটি প্রিয় মুখ আজ স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে রইল। তাঁদের স্নেহ, ভালোবাসা, স্মৃতি ও জীবনের গল্প আপনজনদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল।
মৃত্যুকালে পীযূষ রানী দাশ এক পুত্র ও দুই কন্যাসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।
সন্তান হারানোর বেদনা থেকে চিরবিদায়—শোকের এক বেদনাবিধুর অধ্যায়
একজন মায়ের কাছে সন্তানের চেয়ে প্রিয় আর কী-ই বা হতে পারে! সেই সন্তানকে অকালে হারানোর যে বেদনা, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। পীযূষ রানী দাশের জীবনকাহিনি যেন এক মায়ের অসীম মমতা, গভীর শোক ও নীরব সহনশীলতার বেদনাবিধুর প্রতিচ্ছবি।
মৃত্যু জীবনের চিরন্তন সত্য হলেও প্রিয়জনের বিদায় হৃদয়ে যে শূন্যতা সৃষ্টি করে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। কিছু স্মৃতি সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না; বরং নীরবে হৃদয়ের গভীরে চিরকাল বেঁচে থাকে।
ভগবান শ্রীহরির শ্রীচরণে আত্মার চিরশান্তি কামনা
সনাতন ধর্মের শাশ্বত বিশ্বাস—আত্মা অবিনশ্বর। দেহের বিনাশ ঘটে, কিন্তু আত্মার যাত্রা অব্যাহত থাকে। সেই চিরন্তন বিশ্বাস ও গভীর ভক্তিভরে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরির শ্রীচরণে প্রার্থনা—
হে পরম করুণাময় ভগবান, প্রয়াত পীযূষ রানী দাশ, রবীন্দ্র কুমার দাশ ও অনন্ত বিজয় দাশকে তোমার পবিত্র শ্রীচরণে স্থান দান করো। তাঁদের আত্মা পরম শান্তি লাভ করুক, বৈকুণ্ঠধামে আশ্রয় লাভ করুক।
হে শ্রীহরি, শোকসন্তপ্ত পরিবারের সকল সদস্যকে এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি, ধৈর্য ও মানসিক শান্তি প্রদান করো। তাঁদের হৃদয়ের বেদনা প্রশমিত করো এবং তোমার করুণার ছায়ায় তাঁদের আশ্রয় দাও।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।
প্রয়াত পীযূষ রানী দাশের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা। পরমেশ্বরের চরণে প্রার্থনা—প্রয়াতার আত্মার সদ্গতি ও চিরশান্তি লাভ হোক।